একজন বীরসেনানী মতিয়র রহমান বীরবিক্রম

ভাটি বাংলার এক ঐতিহাসিক জনপদ কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলা। নিকলীকে হাওর বাংলার প্রবেশদ্বার বলা হয়।এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় কিশোরগঞ্জের সবচেয়ে পুরোনো থানা। এককালে পাট উৎপাদন ও ব্যবসায়ের জন্য খ্যাতি ছিল নিকলী। ধান ও মাছের জন্য ও সুনাম আছে নিকলীর। এমনি হাজারো ঐতিহ্য আছে এই জনপদের ।এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে এখানে রচিত হয়েছে ভিন্নতর ইতিহাস । এই ইতিহাসের অনন্য নায়ক মতিয়র রহমান বীরবিক্রম ও তাঁর সহযোদ্ধারা।এই অঞ্চলের বহু সম্মুখ যুদ্ধে তারা অংশগ্রহন করেছিলেন যা আমদের মুক্তিযোদ্ধের ইতিহাসকে আলোকিত করে রেখেছে। মতিয়র রহমানের জন্ম ১ র্মাচ ১৯৫১ সালে নিকলী সদরে। তার পিতার নাম মোঃ কিনু মিয়া,মাতার নাম মোছাঃ হীরা বানু। ১৯৭১ সালে ২৬শে র্মাচ এর র্পূবে তিনি ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ইনষ্টিটিউট এ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ বর্ষে শেষ সেমিষ্টারের ছাত্র ছিলেন। সেই সাথে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন র্পূববাংলা ছাত্র ইউনিয়নের ময়মনসিংহ জেলার সাংগঠানিক সম্পাদক ছিলেন ও পরবর্তীতে তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২৬শে র্মাচ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে ময়মনসিংহ থেকে দুইদিনে পায়ে হেঁটে তিনি নিজগ্রাম নিকলীতে এসে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করে স্থানীয় পাট গুদামে সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করেন। এসময়ে পাকহানাদার বাহিনী হেলিকপ্টারে মজলিশপুর-দামপাড়া বাজারের আশেপাশে মেশিনগানে গোলার্বষন করার ফলে সংগত কারণেই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়।মতিয়র রহমান সমমনা ১৪ জন সঙ্গীসহ প্রশিক্ষন গ্রহনের জন্য ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত এলাকা টেকেরঘাটে চলে যান।সেখান থেকে তৎকালীন এমপি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন বিজয় র্ভামার সহায়তায় মেঘালয়ের গভীর জঙ্গলে প্রতিষ্ঠিত ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ৫ নং সেক্টরের অধীন বড়ছড়া সাবসেক্টর এ কোবরা কোম্পানির কোম্পানি কমান্ডারে এর দায়িত্বপালন করেন তিনি। পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ১০ টি সফল যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে মতিউর রহমান ও তাঁর সহযোদ্ধোরা সেক্টর কমান্ডে প্রসংশিত হন।

প্রশিক্ষণ শেষে তিনি দেশের মাটিতে পর্দাপণ করেই ৬ আগষ্ট বিস্ফোরকের সাহায্যে সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ টেলিযোগাযোগ লাইন বিচ্ছিন্ন করে কৃতিত্ব দেখান। ৮ আগষ্ট সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ থানায় পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানে দুই ইঞ্চি মর্টারের সাহায্যে আক্রমণ পরিচালনা করেন। শত্রু পক্ষের ব্যাংকার দখলের জন্যে তিনি নিজে এলএমজি হাতে শত্রুর ব্যাংকারের মুখ বরাবর অনবরত এলএমজি চালিয়ে এলএমজি‘র রেঞ্জের নিচু দিয়ে ২ জন সাহসী যোদ্ধাকে ক্রলিং করে শত্রুপক্ষের ব্যাংকারে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ব্যাংকার টি দখলে নেন।মূল ক্যাম্প হতে শত্রুর অনবরত গুলাগুলির কারণে আর সম্মুখে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয় বিধায় নিজের এলএমজিটি সহকারীর হাতে দিয়ে শত্রুর ব্যাংকারের মুখ বরাবর অনরবত গুলি করার পদ্ধতি বুঝিয়ে দিয়ে কাধে স্টেনগান ঝুলিয়ে দুই হাতে দুটি গ্রেনেড নিয়ে আরোও দুইজন সহযোদ্ধাসহ উভয়পক্ষর ক্রসফায়ারের মধ্যদিয়ে ক্রলিং করে সফল গ্রেনেড হামলা করার সাথে সাথে আর্তচিৎকারের মধ্যে হানাদার বাহিনী আত্নস্মপন করে এবং কৌশলগত জামালগঞ্জ এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে। শত্রু পক্ষের ৫০টি রাইফেল উদ্ধার করা হয়। ১৫জন সেনা নিহত হয় এবং ১০ জন সেনা বন্দী হয় ।এই যুদ্ধে প্লাটুন কমান্ডার সিরাজ নিহত হন। তার লাশ টেকেরঘাট সীমান্তে দাফন করা হয়।

জামালগঞ্জ যুদ্ধের সাফল্যের পর ৯ আগষ্ট থেকে ২৩ আগষ্ট পর্যন্ত সুরমা নদী থেকে হানাদার বাহিনীর মাল বোঝায়ই ১৯টি র্কাগো লঞ্চ দখলে নিয়ে সাবসেক্টর হেডকোয়ার্টারে প্রেরণ করেন। ২৪ আগষ্ট পাকহানাদার বাহিনী কর্তৃক গানবুটযোগে অতর্কিত হামলায় আক্রান্ত হলে ৫ ঘন্টাস্থায়ী যুদ্ধে রকেট ল্যাঞ্চারের সাহায্যে ১টি গান ডুবিয়ে পাকহানাদার বাহিনীর বিপুল ক্ষতি সাধন করেন। ১২জন নিহত হয় ১০ জন আহত হয়।মুক্তিযোদ্ধা মালেক,রইছ উদ্দিন ও হাকিম শহীদ হন। ৩০ আগষ্ট তাহেরপুর থানা পাকসেনারা পূণঃদখলের জন্য আক্রমণ করলে তিনি ও তার সঙ্গীয় র্ফোস তাহেরপুরে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধোদের শক্তিবৃদ্ধি করার জন্য সেখানে গমণ করেন। তাদের আগমনে তাহিরপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বৃদ্ধি পায় এবং পাকবাহিনীর সাথে কাউকান্দি বাজারে সম্মুখযুদ্ধে তাদের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করা সম্ভব হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের উপর্যোপরি তৎপরতায় বিপযর্স্ত হয়ে ১৩ সেপ্টেম্বর পাকবাহিনী বাদাঘাটে বিমান হামলা চালায়।এই আক্রমণ তারা সাহসিকতার সাতে প্রতিহত করেন।এসব তৎপরতায় মতিয়র রহমান ও তাঁর সহযোদ্ধারা অকুতোভয় সাহসিকতার পরিচয় দেন।

১৯ অক্টোম্বর নিজ থানা নিকলী ,অক্টোম্বররে শেষের দিকে ইটনা ও ১৬ নভেম্বর রক্তক্ষীয় যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অষ্টগ্রাম মুক্ত করে মতিয়র রহমান ও তাঁর সঙ্গীয় র্ফোস কিশোরগঞ্জের ভাটি এলাকায় বিরাট অংশ নিয়ে মুক্তাঞ্চল গঠন করেন। যা মুক্তিযোদ্ধাদের কৌশলগত বিজয় তরান্বিত করেছিল। এসময়ের একটি উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ ছিল গচিহাটা যুদ্ধ।র্পূব পরিকল্পনা অনুযায়ী কটিয়াদী থানার গচিহাটা রেলষ্টেশনের কাছে ২৫ নভেম্বর হানাদার বাহিনী আসার সংবাদ পেয়ে যথাসময়ে রেলেওয়ে ব্রিজের দক্ষিণে তারা অবস্থান নেন।হানাদার বাহিনীকে ধোকা দেওয়ার জন্য তিনি ১ সেকশন মুক্তিযোদ্ধাকে রেলেওয়ে স্টেশনের র্পূবপাশে অবস্থান নিয়ে রেলগাড়ি আসার সাথে সাথে ফায়ার করার র্নিদেশ দিয়ে কোম্পানির বাকি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রেললাইনের পশ্চিম র্পাশে এস্মোস করেন। পাকিস্তানী বাহিনী কিশোরগঞ্জ থেকে রেলযোগে সকাল সাড়ে দশটায় ভাঙ্গা ব্রিজের কাছে পৌঁছামাত্র র্পূবদিক থেকে গুলিবর্ষিত হলে হানাদার বাহিনী র্পূবদিক থেকে আক্রমন হয়েছে ভেবে পশ্চিম পার্শ্বে অবতরন করে।সাথে সাথে এম্বোসে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে একযোগে গুলি করার সংকেত দিয়ে তিনি নিজে এলএমজি‘র সামায্যে মুহুর্মুহ গুলি করতে থাকে। অতির্কিত হামলায় পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনসহ ২০ জন পাকসেনা নিহত হয়।বাকি পাকসেনা ট্রেনে।

উল্লেখ্য, আগামী (৬ অক্টোবর) এই বীর সেনানীর ৮ম মৃত্যু বার্ষিকী।

লেখকঃ মহিবুর রহিম
(মতিয়র রহমান বীরবিক্রম এর জীবনী থেকে সংগ্রহীত)

Facebook Comments
custom_html_banner1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *