কিশোরগঞ্জের শহীদ খায়রুল জাহান বীর প্রতীক এখন শুধুই স্মৃতি

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ ২৬ নভেম্বর কিশোরগঞ্জের কৃতি সন্তান শহীদ খায়রুল জাহান তালুকদার বীর প্রতীকের শাহাদাৎ বার্ষিকী। এ উপলক্ষে মঙ্গলবার বিভিন্ন কর্মসুচী নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

অগনিত শহীদের আত্মোৎসর্গে স্বাধীন হয়েছিল আমাদের এদেশ। পরম গৌরবে মন্ডিত মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোর ভেতর চরম শোকের অসংখ্য ঘটনা আছে। সেই সব শোক ও গৌরবের একটি হচ্ছে কিশোরগঞ্জের বীর প্রতীক শহীদ খায়রুল জাহানের আত্মদান। ছোটবেলা থেকে খায়রুল জাহান ছিলেন সাহসী প্রকৃতির, যে কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন। জেলা সদরের লতিফপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক পড়াশোনা করে ১৯৬৭ সালে কিশোরগঞ্জ সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয় হতে এসএসসি পাশ করেন। ১৯৬৯ সালে ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের অধ্যায়নরত ছিলেন। পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে পরিক্ষা দিয়ে মনোনীত হয়েছিলেন, পশ্চিম পাকিস্থানে গিয়ে প্রশিক্ষন নেয়ার জন্য চিঠি আসে মার্চ মাসের ২৭ তারিখ কিন্তু তখন পাকিস্থানী আর্মিরা মেতে উঠেছে বাঙ্গালী হত্যাযজ্ঞে। পাকিস্থান বিমান বাহিনীর অফিসার হওয়ার চেয়ে যুদ্ধ করে মাতৃভূমিকে মুক্তকরার সঠিক মনে করলেন খায়রুল জাহান। অতি আদরের বড়ছেলে যুদ্ধে যাবে বাবা আব্দুল হাই তালুকদার ও মা বেগম শামসুন্নাহারের মন সায় দিতে চায় না।
খায়রুল জাহান মুখে হাসি নিয়ে বলেন মা তোমার চারটি ছেলে কাজল, নয়ন, লেলিন তো রইলো, একটি ছেলেকে স্বাধীনতার জন্য উৎসর্গ কর। সেই দিনের সেই আলোচনার সময় নয়ন কাছেই ছিলেন। নয়ন ভাই দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললেন মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ভায়ের কথা যে এমন নির্মম সত্য হয়ে ফলবে তা কি তখন ভাবতে পেরেছিলাম !
কিশোরগঞ্জের মুক্তিকামী তরুণ যুবকদের সংঘটিত করে খায়রুল জাহান বাসা থেকে বের হয়ে পড়েন জুন মাসের ৭ তারিখ। ভারতের মেঘালয়ে মেজর হায়দারের অধীনে সামরিক প্রশিক্ষন নিয়ে মেজর খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে ২ নং সেক্টরের গ্রুপ কমান্ডার হিসাবে পাকিস্থানীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য লড়াই করেন। নভেম্বরে চলে আসেন গ্রামের বাড়ী লতিফপুরে বেশ কয়েক জন মুক্তিযোদ্ধাকে সাথে নিয়ে কিশোরগঞ্জ শহরে অপারেশন চালাবার পরিকল্পনা করেন। ভোর বেলায় প্যারাভাঙ্গায় তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। সহযোদ্ধাদের নিরাপদে স’রে যাবার সুযোগ সৃষ্টির জন্য খায়রুল জাহান জীবনের ঝঁুকি নিয়ে একাই গুলি ছুড়তে থাকেন শত্রুর উপর। সহযোদ্ধাদের অধিকাংশই অক্ষত অবস্থায় স’রে যেতে পারে। ৭-৮ জন পাক আর্মি নিহত হয় প্যারাভাংগার যুদ্ধে। শত শত পাক আর্মির বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে একপর্যায়ে প্রতিপক্ষের গুলির আঘাতে শহীদ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল জাহান। এ যুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধা সেলিম ও শহীদ হয়েছিলেন। দিনটি ছিল নভেম্বরের ২৬ তারিখ। বীর মুক্তিযোদ্ধা খায়রুলের ছোট ভাই নয়ন তখন ৮ম শ্রেণীতে পড়াশুনা করছিলেন । বড় ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ পান দুপুর বেলায়। সাইকেল নিয়ে তখনি ছুটে যান বাসায় দেখেন রাজাকার ও পাক আর্মিরা বাসা ঘিরে রেখেছে। পিতা আব্দুল হাই তালুকদার তখন বাসায় ছিলেন না। রাজাকার হোসাইন তার পেন্টে লেগে থাকা শহীদ খায়রুলের রক্ত মাকে দেখিয়ে উল্লাস করে, চিৎকার করে গালি গালাজ করে।
ব্যাথিত অতীথ যেন বর্তমান হয়ে দেখা দেয়। ৪৮ বছর আগে ভাইকে হারানোর কথা বলতে গিয়ে নয়ন ভাই নিশ্চুপ হয়ে পড়েন। তিনি ঘাতকদের বিরুদ্ধে আন্তজার্তিক অপরাধ ট্রাইবুনালের দেওয়া রায় দ্রুত কার্যকর দেখতে চান। তার স্মৃতি রক্ষার্থে প্যারাভাঙ্গা গ্রামের সেই রণভূমিতে একটি স্মৃতি স্তম্ভ রয়েছে। ১৯৭২ সালের জানুয়ারী মাসে দেশের প্রথম অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম এ ফলকটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। ময়মনসিংহ কারিগরী ছাত্রাবাসের নাম রাখা হয়েছে ‘ শহীদ খায়রুল ছাত্রাবাস’। কিন্ত নিজ জেলায় তাঁর নামে গড়ে ওঠেনি কোন স্মৃতি।
কিশোরগঞ্জ যুদ্ধাপরাধ প্রতিরোধ আন্দোলন কমিটির সভাপতি মোঃ রেজাউল হাবীব রেজা বলেন, শহীদ খায়রুল জাহানের হত্যাকান্ডের তদন্তকালে আমি আন্তজার্তিক অপরাধ ট্রাইব্যুানালে সহযোগীতায় ছিলাম। সঙ্গী হিসেবে নজরুল ইসলাম খায়রুলও ছিলো। তদন্ত করতে আন্তজার্তিক অপরাধ ট্রাব্যুানালের তদন্ত কর্মকতার্ হরি দেব নাথ কিশোরগঞ্জে এসেছিলেন।এ সময় প্যারাভাঙ্গাসহ নিকলীতে তদন্ত করে সৈয়দ হোসাইন কর্তৃক শহীদ খায়রুল জাহানের হত্যাকান্ডের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছিলেন।যার ক্ষতে সৈয়দ হোসাইনের ফাঁসির দন্ড দিয়েছে ট্রাব্যুানাল। কিন্ত এ যাবত এ দন্ড প্রাপ্ত আসামী পলাতক থাকায় তার রায় কার্যকর করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও মুুিক্তযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি হতাশা ব্যক্ত করছে। আমি অবিলম্ভে এ রায়ের বাস্তবায়ন দেখতে চাই।
শহীদ খায়রুল জাহান বীরপ্রতীকের সহযোদ্ধা বীরমুক্তিযোদ্ধা আলী মাস্টার বলেন, ‘২৬ নভেম্বর কিশোরগঞ্জ শহরের কাছাকাছি রাজাকারদের একটি ক্যাম্প দখল করার প্রস্তুতি নিই আমরা। কিন্তু কেউ একজন পাকিস্তানি বাহিনীকে খবরটা আগেই জানিয়ে দিয়েছিল। ফলে রাতেই প্যারাভাঙ্গা এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের ৩০-৩৫ জনের দলটিকে ঘিরে ফেলেছিল কয়েক শ রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনা। ভোর থেকে শুরু হয় তুমুল গোলাগুলি। জয়ের সম্ভাবনা না দেখে মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল জাহান (বীরপ্রতীক) মেশিনগান নিয়ে রাস্তায় উঠে গুলি করতে করতে শত্রুদের ঠেকিয়ে রাখেন আর চিৎকার করে আমাদের পালিয়ে যেতে বলেন। একসময় পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হন তিনি। কিন্তু তাদের হাতে ধরা দেননি। এর আগেই গ্রেনেড চার্জ করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। তাঁর জীবনের বিনিময়ে সেদিন প্রায় সব মুক্তিযোদ্ধা প্রাণে রক্ষা পায়। ওই যুদ্ধে খায়রুলসহ আরো চার-পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছিল।’
প্যারাভাঙ্গার স্থানীয় বাসিন্দা রহমত উল্লাহ বলেন, আমি শহীদ খায়রুলকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। নিজের জীবন দিয়ে সহযোদ্ধাদেরকে বাঁচিয়ে বিরল ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।
শহীদ খায়রুল স্মৃতি সংসদের সভাপতি একে নাছিম খান জানান,২৬ নভেম্বর শহীদ খায়রুল জাহানের স্মরণে খরমপট্রি জামে মসজিদে বাদ আছর মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

Facebook Comments
custom_html_banner1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *