কুড়িগ্রাম জেলায় শীতের আগমনী বার্তা; খেজুরের রসের ঘ্রাণে মুখরিত

এজি লাভলু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: কুড়িগ্রামের ৯ উপজেলায় ঝিরঝির বাতাসটায় শিহরণে গা শিশিরটা ছুঁয়ে দেয় সবুজের পা। সূযের্র হাসিটায় নেই ঝিকমিক, কুয়াশার চাদরে শীত এলো ঠিক।

সকালে ফোঁটা ফুলের পাতায় লেগে থাকে ছোপ ছোপ কুয়াশা। সেই সকালে তাঁত বোনা চাঁদর গায়ে জড়িয়ে একঝাক শিশু-কিশোর।এলো চুলের চেহারা দেখলে বোঝা যায় চোখ থেকে ঘুম সরেনি।

তবে এই শীত সকালে লেপের ওমটুকু ছেড়ে তারাও বের হয় কুয়াশা মোড়া রাস্তায়। জানতে চাইলে আলতো হাসিতে উত্তর আসে, খেজুরের রস খুঁজছি খাবার জন্য।

শীত আসতেই খেজুরের রসের ঘ্রাণে ভরে ওঠে বাংলার প্রকৃতি। গ্রামে-গঞ্জে শুরু হয়েছে সেই খেজুর রস আর খেজুর গুড়সহ নানা উপাদানে তৈরি পিঠা খাওয়ার ধুম। গ্রাম থেকে আসা রাজারহাট শহরের জীবনও যে আবহমান বাংলার চিরন্তন এই সংস্কৃতির ছোঁয়া নিতে উতলা। তাই তো তারাও খুঁজে ফেরে সেই খেজুর রসের ঘ্রাণ। তের আইলপথে চলতে চলতে শিশিরে ভিজে যাওয়া পায়ের পাতা। সন্ধ্যে হলেই গাছে গাছে বাঁধা হচ্ছে হাঁড়ি। সকাল হতে না হতেই খেজুর রসের চেনা স্বাদে মাতোয়ারা। বাড়ির উঠোন বা ধান কেটে নেওয়া শূন্য মাঠে গোল হয়ে বসে সেই রস আস্বাদন, মাটির ছোট হাড়িতে ঠোঁট ছুইয়ে খেজুর রসের স্বাদ নেওয়া অতুলনীয়। আর সাথে যদি শুকনো পাতার তৈরি বাটিতে খই, মুড়ি আর খেজুর গুড় পাওয়া যায়, তবে তো পরিচয় মেলে বাঙালির একে অপরে মেতে ওঠার রসবোধের সাথেও।

আর্দশ বিএল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক লুৎফর রহমান আশু বলেন, শৈশব-কৈশোরটা যাদের গ্রামে কেটেছে, খেজুর গাছ থেকে রসের হাড়ি চুরি করে রস খাওয়া তাদের অনেকেরই একটি মূল্যবান স্মৃতি। এখন তো অনেকেই বয়সের ভারে নতজানু। অনেকেই আবার কাজের ব্যস্ততায় সঠিক সময়ে গ্রামে যেতে পারেন না। ফলে অনেকেই এ জায়গাটা থেকে বেশ ভালোভাবে বঞ্চিত হন।

বর্তমান ছেলে-মেয়েরা বিভিন্ন ধরনের কোমল পানীয়ের স্বাদ জানে, কিন্তু তারা খেজুর রসের স্বাদ জানে না। খেজুর রস আমাদের আর পাঁচটা সংস্কৃতির মতোই। আমাদের উচিত এটার প্রতি আরো যত্নবান হওয়া। আমরা অতীতমুখী নই, তবে সেখান থেকে আমাদের শিখতে হবে। আমরা কখনই ঐহিত্য বিমুখ হতে চাই না,’ বলেন তিনি।

এক দশক আগেও শীতের সকালে চোখে পড়তো রসের হাড়ি ও খেজুর গাছ কাটার সরঞ্জামসহ গাছির ব্যস্ততার দৃশ্য। সাত সকালে খেজুরের রস নিয়ে গাছিরা বাড়ি বাড়ি হাঁক ডাক দিতেন।

শীতের মৌসুম শুরু হতেই বাড়ি বাড়ি চলতো খেজুরের রস কিংবা রসের পাটালি গুড় দিয়ে মজাদার পিঠাপুলির আয়োজন। সে আয়োজন শিখিয়ে দিতো একান্নবর্তী পরিবার বা সমাজে সকলে একসঙ্গে থাকার স্বাদ ও মানবিকতাও। তবে গ্রামবাংলার এ দৃশ্য এখন আর তেমন নেই। বিভিন্ন কারণে খেজুর গাছ নিধন এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে গাছির সংখ্যা কমে যাওয়ায় এখন দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে খেজুরের রসও ।

কুড়িগ্রাম সদরের ভোগডাঙ্গা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বলেন, এখন আমরা শেকড় ভুলে যাচ্ছি। কিন্তু নিজেদের শেকড়ের কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। মা, মাতৃভূমি ও সংস্কৃতি একই সঙ্গে জড়ানো। এগুলোর ভেতর দিয়েই আমরা মানুষ হয়েছি। আসুন সকলে মিলে গ্রামের জন্য মঙ্গল কামনা করি, গ্রামগুলো যেন ভালো থাকে।এখনও গ্রামের মাঠে আর মেঠোপথের ধারে কিছু গাছ দাঁড়িয়ে আছে কালের সাী হয়ে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এই খেজুরগাছ আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে। যে হারে খেজুরগাছ নিধন হচ্ছে সে তুলনায় রোপণ করা হয় না।’

রাজারহাট উপজেলার বিআরডিবির অপ্রধান শস্য উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক ফিল্ড অফিসার জয়নবী খাতুন বলেন, খেজুর গাছ কমতে থাকলেও তা এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। সুস্বাদ ও পিঠাপুলির জন্য অতি আবশ্যক উপকরণ হওয়ায় এখনও খেজুর রসের চাহিদা রয়েছে। তবে আগের মতো রস ও গুড় পাওয়া যায় না। পেলেও আগের চেয়ে ১০ গুণ বেশি দাম দিয়ে কিনতে হয়।

গাছি আঃ রশীদ জানান, খেজুরের গাছ কমে যাওয়ায় তাদের চাহিদাও কমে গেছে। আগে এই কাজ করে ভালোভাবেই সংসার চলতো এমনকি সঞ্চয়ও থাকতো। গ্রামে যে কয়েকটা খেজুর গাছ আছে তা বুড়ো হয়ে যাওয়ায় এখন আর তেমন রস পাওয়া যায় না।

রস বাজারে বিক্রির মতো আগের সেই অবস্থাও নেই।এইতো কয়েক বছর আগে এক হাড়ি খেজুর রস বিক্রি করতাম ২০ টাকায়। দিন দিন খেজুর গাছ কমে যাচ্ছে। প্রকৃতিগত সুস্বাদু সে রসও এখন আর তেমন আগের মতো নেই। তবুও কয়েকটা গাছের পরিচর্যা করে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। এখন খেজুর গাছ না থাকায় ২০ টাকার রসের দাম বেড়ে হয়েছে ২০০ টাকা।

Facebook Comments
custom_html_banner1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *