নিজামের ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা দিলেন মৎস্যজীবী বিশ্বনাথ

এজি লাভলু, স্টাফ রিপোর্টার:

২১ দিন পর জেল থেকে বেরিয়ে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের প্রত্যাহার হওয়া আরডিসি নাজিম উদ্দিনের হাতে নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দিলেন নির্যাতিত দরিদ্র মৎস্যজীবী বিশ্বনাথ।

গতকাল (১৭ মার্চ) জেল থেকে বেরিয়ে অসুস্থ অবস্থায় কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ভর্তি হন বিশ্বনাথ। সেখানে আরডিসি নিজাম উদ্দিনের বর্বরোচিত নির্যাতন এবং পুরো ঘটনা সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন তিনি।

বিশ্বনাথ সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘গতকাল থেকে বের করে ওনার (আরডিসি নাজিম উদ্দিন) গেস্ট হাউসে নিয়ে যান।

তিনি আমাকে বলেন, ‘তোমার নামে তো ক্রসফায়ারের অর্ডার হয়া গেছে। তুমি তো ক্রসফায়ারে যাবা, র‌্যাবে তোমাকে খুঁজতেছে। তোমার বাঁচার একটা পথ আছে সেটা হলো- আমি যেভাবে বলতেছি, আমি যখন রেকর্ড চালু করবো তখন তুমি সেইভাবেই বলবা।’ উনার কথা শুনে আমি ভয় পেয়ে যাই।

‘উনি বলতে শিখিয়ে দেন- ‘জেল থেকে বের হওয়ার পর কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলবা, নাজিম উদ্দিন স্যার আমাকে মারে নাই। সাংবাদিক শিখায় দিছে। আর তুমি এখান থেকে রংপুর চলে যাও, ঐ পার্শ্বে চলে যাও। সেখানে মোবাইল-টোবাইল বন্ধ করে ছয় মাস থাকবা। বাড়িতে কাউকে ফোন দিবা না, ঐ পার্শ্বে চলে যাও। তোমার কী লাগে আমার এই নাম্বারে ফোন দিবা। আমি তোমার চলার ব্যবস্থা করে দেবো।’ এই কথাগুলো বলার পর তিনি আমাকে খলিলগঞ্জের দিকে নামিয়ে দিয়ে চলে যান।”

আরডিসি নাজিম উদ্দিন তাকে কেনো নির্যাতন করেছেন- জানতে চাইলে বিশ্বনাথ বলেন, ‘‘আমরা মৎস্যজীবী হিসেবে নাগেশ্বরী উপজেলার দেবীকুড়া বিলটি ‘মানুষের সমিতি’র নামে লিজ নিয়ে মাছ চাষ করে আসছিলাম। লিজের সময় শেষ হওয়ার ছয় মাস বাকি থাকতে আমি উন্নয়ন প্রকল্পে ছয় বছর লিজের জন্য আদালতে আবেদন করি।

‘সে সময় ওই বিলে প্রায় ১০ লাখ টাকার মাছ ছিল। এ অবস্থায় বিলটিকে উন্মুক্ত দেখানো হয়। এরপর আমরা স্যারের (নাজিম উদ্দিন) কাছে যাই। তিনি বিভিন্ন কথা বলেন। কিন্তু বিল উন্মুক্ত নয়, এখনো যে লিজে আছে সেটি ঠিকঠাক করতে রাজি হন না।”

বিশ্বনাথ বলেন, ‘‘উনার সাথে সর্বশেষ যেদিন দেখা করলাম, তার দুই দিন পর রাত দুইটার দিকে নাজিম উদ্দিন স্যার আমার বাসায় এসে আমাকে ঘুম থেকে তুলে বাইরে নিয়ে যান। এরপর আমাকে বেধড়ক মারধর করেন। মারধরের পর আমাকে নাগেশ্বরী থেকে কুড়িগ্রামে নেওয়া হয়। উনার চেম্বারে নিয়ে গিয়ে আমার হাত-পা বাঁধেন। এরপর আবারও মারধর শুরু হয়।

‘মারতে মারতে তিনি বলেন, ‘মামলা ওঠাস না কেন? তোর কোন বাপ আছে বাঁচাবে? আমি পাঁচ দিন পরপর তোমাকে রিমান্ডে নিব। হাজতে আসবো আর তোমাকে মারব, সবাই হাসবে।’ মারধরের এক পর্যায়ে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। জ্ঞান ফিরে নিজেকে হাজতে দেখতে পাই।”

বিশ্বনাথের ভাই স্বপন চন্দ্র দাস বলেন, ১৬ মার্চ রাতে আমরা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের কাছে আমার ভাইয়ের জামিনের আবেদন করেছিলাম। তিনি আমাদেরকে মঙ্গলবার দুপুরের দিকে গিয়ে বিশ্বনাথকে নিয়ে যেতে বলেছিলেন। সকালে জানতে পারি, তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অসুস্থ থাকায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।’

কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারের কারারক্ষী খালিদ হাসান বলেন, ‘‘বিশ্বনাথকে মামলার দুটি ধারার মধ্যে একটি ধারায় এক মাস, অপর একটি ধারায় এক বছর ১১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

১৭ মার্চ সকালে তার জামিনের কাগজ আসায় তাকে আমরা মুক্তি দেই। কুড়িগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুজাউদ্দৌলা গতরাতে তার জামিন মঞ্জুর করান।’’

তবে এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সুজাউদ্দৌলা ও প্রত্যাহার হওয়া আরডিসি নাজিম উদ্দিনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রসঙ্গত, কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের আরডিসি নাজিম উদ্দিন কর্তৃক নির্যাতিত বিশ্বনাথের বাড়ি নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের পরম আলী গ্রামের কলেজ মোড় এলাকায়। মৎস্যজীবী হিসেবে ঐ ইউনিয়নের একটি জলাশয় সমিতির নামে লিজ নিয়ে মাছ চাষ করে আসছিলেন তিনি।

লিজের ছয় মাস বাকি থাকতে চাষ করা মাছসহ বিলটিকে অবৈধভাবে উন্মুক্ত ঘোষণা করেন আরডিসি নাজিম উদ্দিন। পরে বিশ্বনাথসহ অন্যান্য মাছ চাষীরা বিলটি পেতে আদালতের আশ্রয় নেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে নাজিম উদ্দিন ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিশ্বনাথের উপর অকথ্য নির্যাতন চালান। পরে তাকে মামলার মাধ্যমে দুই বছরের জেল প্রদান করেন।

Facebook Comments
custom_html_banner1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *